Monday, December 1, 2025
Google search engine
Homeইতিহাসপৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: পর্ব – ২

পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: পর্ব – ২

মানব সভ্যতার ইতিহাস প্রাচীন এবং বিস্তৃত। পৃথিবীতে সভ্যতার বিকাশ এক দিনে ঘটেনি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে। ইতিহাসবিদরা সভ্যতার বিকাশকে প্রধানত দুই যুগে ভাগ করেছেন—

১. প্রাগৈতিহাসিক যুগ: লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী সময়কাল।

২. ঐতিহাসিক যুগ: লিখিত ইতিহাস দ্বারা জানা সময়কাল।

প্রাগৈতিহাসিক যুগের অবসানের মধ্য দিয়েই সভ্যতার সূচনা ঘটে। সেই সময়ের প্রাচীন সভ্যতাগুলো মানবজীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতির ভিত্তি স্থাপন করে।

এর আগে আলোচনায় মিশরীয়, মেসোপটেমীয়, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এবার দেখা যাক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন সভ্যতাগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

ক্যালডীয় সভ্যতা

মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে, পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় ক্যালডীয় সভ্যতার উত্থান ঘটে। সেমিটিক জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ক্যালডীয়রা নেবপালেসারের নেতৃত্বে আসিরীয় রাজধানী নিনেভা ধ্বংস করে এবং পুনর্গঠিত ব্যাবিলন নগরীকে কেন্দ্র করে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এজন্য এ সভ্যতা “নব্য ব্যাবিলনীয় সভ্যতা” নামেও পরিচিত।

ক্যালডীয় সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ব্যাবিলনের বিখ্যাত শূন্য উদ্যান, যা প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে বিবেচিত।

সিন্ধু সভ্যতা

বিশ্বের প্রাচীনতম নগরসভ্যতাগুলোর একটি হলো সিন্ধু সভ্যতা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩২৫০–২৭৫০ অব্দে এর বিকাশ ঘটে। এই সভ্যতা বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু নদ ও তার অববাহিকায় গড়ে ওঠে। প্রধান নগর ছিল হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো।

সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত স্যানিটেশন ও স্থাপত্যশৈলীতে বিশেষভাবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী এই সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। যদিও তাদের লিখন পদ্ধতি আজও সম্পূর্ণভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়নি।

ফিনিশীয় সভ্যতা

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী সরু ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা ফিনিশীয় সভ্যতা নৌ-বাণিজ্য ও জাহাজ নির্মাণে খ্যাতি লাভ করে। কৃষির জন্য উপযুক্ত জমি না থাকায় তারা প্রধানত সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলে।

তাদের বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর ছিল টায়ার ও সিডন। ফিনিশীয়রা বিশ্বের প্রথমদিককার বর্ণমালার উদ্ভাবক হিসেবেও পরিচিত।

পারস্য সভ্যতা

আজকের ইরান অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারস্য সভ্যতার উত্থান ঘটে। পারস্য সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল দানিয়ুব নদী থেকে রাশিয়ার দক্ষিণ সীমা পর্যন্ত।

পারস্য রাজারা সামরিক দক্ষতা, শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ও ধর্ম-শিল্প-সাহিত্যে অবদানের জন্য ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। পারস্য সাম্রাজ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সুবিন্যস্ত প্রশাসন ও ধর্মীয় সহনশীলতা।

হিব্রু সভ্যতা

হিব্রু সভ্যতা মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে বিকাশ লাভ করে। জাতিগতভাবে তারা ছিল মিশ্র। যদিও স্থাপত্য বা চিত্রকলায় তাদের অবদান সীমিত ছিল, ধর্ম ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব ছিল গভীর।

ইহুদি ধর্ম হিব্রু সভ্যতারই সৃষ্টি, যা পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

চীন সভ্যতা

চীন হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন নদীভিত্তিক সভ্যতা। হোয়াংহো ও ইয়াংজি নদীর তীর এবং দক্ষিণ চীনের অঞ্চলজুড়ে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে।

চীনের প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে লাওৎসের তাওবাদ এবং কনফুসিয়াসের কনফুসিয়ান চিন্তাধারা উল্লেখযোগ্য। চীনা সভ্যতা কাগজ, গানপাউডার, কম্পাস ও ছাপাখানার মতো উদ্ভাবনের জন্যও বিশ্ব ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা পায়।

গ্রিক সভ্যতা

গ্রিক সভ্যতা ইউরোপের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটি। নগররাষ্ট্র (City-State) ছিল এর মূল বৈশিষ্ট্য। এথেন্স ও স্পার্টা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগররাষ্ট্র।

গ্রিক সভ্যতা দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি ও শিল্পকলায় অসাধারণ অবদান রাখে। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, হোমারসহ অসংখ্য মনীষী এ সভ্যতার গৌরব বৃদ্ধি করেছেন।

রোমান সভ্যতা

রোম নগরীকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে রোমান সভ্যতার উত্থান ঘটে। ইতিহাসে রোমান সাম্রাজ্যকে অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে ধরা হয়।

রোমানরা সামরিক শক্তি, আইন, প্রশাসন ও স্থাপত্যশৈলীতে অগ্রগণ্য ছিল। তাদের তৈরি কলোসিয়াম, অ্যাকুয়েডাক্ট এবং সড়কব্যবস্থা আজও স্থাপত্যের বিস্ময় হিসেবে বিবেচিত।

উপসংহার

প্রাচীন সভ্যতাগুলো মানব ইতিহাসে অমূল্য অবদান রেখেছে। ক্যালডীয়দের স্থাপত্য, সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা, ফিনিশীয়দের নৌ-বাণিজ্য, পারস্যদের প্রশাসন, হিব্রুদের ধর্ম, চীনের দর্শন, গ্রিকদের জ্ঞানচর্চা ও রোমানদের সামরিক শক্তি—সব মিলেই আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular