Thursday, February 26, 2026
Google search engine
Homeদর্শনপ্রচলিত মতবাদ (পর্ব ২): সাম্রাজ্যবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ও উদারতাবাদ

প্রচলিত মতবাদ (পর্ব ২): সাম্রাজ্যবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ও উদারতাবাদ

মানুষের সমাজ এক দিনে গড়ে ওঠেনি। সভ্যতার এই জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে, নানা চিন্তাধারা ও মতবাদের প্রভাবে। সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন দর্শন এসেছে, পুরনো ধারণা বদলেছে, কিছু যোগ হয়েছে, কিছু হারিয়েছে। আজ আমরা আলোচনা করব এমন পাঁচটি মতবাদ নিয়ে—যেগুলো রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক জীবনের ধারা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সাম্রাজ্যবাদ: শক্তিশালীর প্রভাব বিস্তার

সাম্রাজ্যবাদকে সহজভাবে বলা যায়—একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। ইতিহাসে আমরা দেখি সুমেরীয়, মিশরীয়, চীনা, পারসিক ও রোমান সাম্রাজ্য—যারা অন্য দেশ দখল করে নিজেদের অধীনে রাখত। অতীতে এই দখল ছিল সরাসরি শাসন ও শোষণের মাধ্যমে; কিন্তু আধুনিক যুগে সাম্রাজ্যবাদের রূপ বদলেছে।শক্তিধর দেশের প্রভাব বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার এখন অর্থনীতি, বিশেষ করে বাজার অর্থনীতি।

লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে বলেছিলেন “পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর”। কারণ, পুঁজিবাদ মানে কয়েকজনের হাতে সম্পদ ও উৎপাদন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা, ফলে তখন তারা শুধু নিজ দেশেই নয়, অন্য দেশেও প্রভাব বিস্তার করে। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ স্থানীয় সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ: ব্যক্তির স্বাধীনতার পক্ষে

মধ্যযুগে রাজা বা সম্রাটের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক সময় দাবি ওঠে—ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ সেই দাবিরই দার্শনিক ভিত্তি। সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ড এবং অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে এই মতবাদ গুরুত্ব পায়। এখানে বলা হয়, রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীনতায় অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করবে না; বরং তাকে নিরাপত্তা দেবে এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।

এই ভাবনার পেছনে ছিল “সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব”—যেখানে বলা হয় রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে মানুষের পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে, কোনো শাসকের ইচ্ছায় নয়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এর ধারনায় মানুষকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দেয়া এবং তার সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা না দেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিকতাবাদ: সীমান্তের ঊর্ধ্বে মানবতা

আন্তর্জাতিকতাবাদ মূলত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিপরীত একটি চিন্তাধারা। এর লক্ষ্য হলো—বিশ্বের দেশ ও জাতির মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা এবং বিশ্বমানবতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন জাতীয়তাবাদ চরমে পৌঁছায়, তখন তা অন্য জাতির প্রতি বৈরিতা তৈরি করে—যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইতালির ফ্যাসিবাদ ও জার্মানির নাৎসিবাদ।

যুদ্ধের ভয়াবহতার পর, বিশ্বে শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিকতাবাদ বলে; ‘আমাদের জাতীয়, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সীমানা পেরিয়ে বৃহত্তর মানবিক স্বার্থে এক হওয়া উচিত।‘

 জাতীয়তাবাদ: জাতির প্রতি আনুগত্য

জাতীয়তাবাদে জাতি ও রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের জন্য এটি অনেক সময় ঐক্যের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে—যা মানুষকে একটি সাধারণ লক্ষ্যে একত্রিত করে। তবে জাতীয়তাবাদের একটি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তীব্র জাতীয়তাবাদ অন্য জাতির প্রতি বৈরিতা সৃষ্টি করে ও সংঘাত ডেকে আনে।

জাতীয়তাবাদ ইতিহাসে অনেক বড় অর্জনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে, আবার একইসাথে অনেক যুদ্ধ ও বিভেদের কারণও হয়েছে।

উদারতাবাদ: স্বাধীনতা ও সহনশীলতা

সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে  উদারতাবাদ জন্ম নেয়। এর মূল বার্তা হলোঃ আইনের শাসন, ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার। আধুনিক উদারতাবাদ শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা শেখায়।

সাম্রাজ্যবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ও উদারতাবাদ—আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক চিন্তাকে গঠন করেছে। ইতিহাসের ধারায় এগুলো কখনো ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়েছে, কখনো আবার সংঘাত ও বিভেদের উৎস হয়েছে। এসব মতবাদ বোঝা মানে শুধু অতীতকে জানা নয়; বরং বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণে প্রস্তুত হওয়া।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular