কালের পরিক্রমায় হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের ভাবনা ও মতবাদে এসেছে পরিবর্তন।কখনো সমাজ, কখনো রাজনীতি, আবার কখনো ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিবর্তনে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন চিন্তা। কিছু মতবাদ ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে, আবার কিছুর প্রভাব আজও মানুষের চিন্তাধারায় রয়েছে।
আজ আমরা সহজ ভাষায় জানব পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ— অজ্ঞেয়বাদ, ভাববাদ, ঐতিহাসিকতাবাদ, সুখবাদ ও বুদ্ধিবাদ—যেগুলো শুধু দর্শন নয়, আমাদের ভাবনার ধরনও বদলে দিয়েছে।
অজ্ঞেয়বাদ; জানা/অজানা
প্লেটোর গুহার রূপকঃ জ্ঞান ও ভ্রম।
১৮৬৯ সালে বিজ্ঞানী **টমাস হেনরি হাক্সলি** প্রথম “Agnosticism” শব্দটি চালু করেন। এর মূল কথা হলো—**ঈশ্বর আছেন কি নেই, এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মানুষ দিতে পারবে না।**
অজ্ঞেয়বাদীরা মনে করেন, কিছু বিষয় মানুষের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার বাইরে। যেমন মহাবিশ্বের শুরু কিভাবে হলো, বা প্রকৃতির কিছু রহস্য কেন ঘটে।
বৌদ্ধ দর্শনেও এর মিল পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয় ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা সম্ভব নয়।
আবার আধুনিক অজ্ঞেয়বাদ শুধু ঈশ্বর বা ধর্মের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অজ্ঞেয়বাদীদের মতে শুধু ঈশ্বরই অজ্ঞেয় নয়, প্রাকৃতিক বিধান, সমাজ বিকাশের ধারা সবই অজ্ঞেয়।
ভাববাদ; বস্তুর চাইতে চেতনার গুরুত্ব
ভাববাদ বলে—‘দেহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আত্মা বা চেতনা চিরস্থায়ী’।
ভাববাদীরা বিশ্বাস করেন, যা কিছু আমরা দেখি বা বুঝি, সবই আমাদের চিন্তা ও চেতনার মাধ্যমে আসে।
দর্শনে ভাববাদকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ঃ
১.বাস্তব ভাববাদ,
২.মনময় ভাববাদ।
বাস্তব ভাববাদে মনের বাইরে যে কোন ভাবকে সকল কিছুর মূল বলে মেনে নেয়া হয়।এই ভাবকে ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝা যায় না। সেটাকে বুদ্ধি ও মন দিয়ে বুঝতে হয়।
এই ভাব সকল কিছুর ঊর্ধ্বে।
আর মনময় ভাববাদে মনের চেতনাকেই অস্তিত্বের মূল বলা হয়। মনের ভাবের বাইরে মানুষ কোন বস্তুর অস্তিত্বসম্বন্ধে জানতে পারে না। জগত আছে বলে ব্যক্তি দেখে , তা নয়, বরং সে দেখে বলেই কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে। অভিজ্ঞতার বাইরে কোন কিছুর অস্তিত্ব সম্বন্ধে মানুষ জানতে পারে না।
ঐতিহাসিকতাবাদ; সত্য বুঝতে হলে অতীত জানতে হবে
ঐতিহাসিকতাবাদের মতে— ‘কোনো ঘটনার সত্যতা বোঝার জন্য তার সময় ও পরিস্থিতি জানা জরুরি।‘
আফ্রিকান ইউনিয়ন ইতিহাস: ঐক্যের পথে আফ্রিকার দীর্ঘযাত্রা
প্রাচীন ও মধ্যযুগে এই বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, ইতিহাস প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে এবং ইতিহাসের এই আবর্তনে নতুন কোন কিছুর বিকাশ হয় না। ফলে কোন সমস্যা সমাধানে ইতিহাসের কোন প্রভাব নেই। ।
কিন্তু ঐতিহাসিকতাবাদ অনুযায়ী কোন ঘটনাই কাল নিরপেক্ষ নয়। অতীতের ঘটনাবলীর বিকাশই বর্তমান ঘটনার রূপরেখা তৈরী করছে। তেমনি বর্তমান বিকাশের প্রবাহই ভবিষ্যতকে নিরূপণ করবে। তবে অতীত কখনো ভবিষ্যতে ফিরে আসেনা।
ঐতিহাসিকতাবাদের আলোকে ডারউইন জীববিজ্ঞানের বিকাশকে এবং কার্ল মার্ক্স সামাজিক জীবনের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।

সুখবাদ; জীবনের লক্ষ্য আনন্দ খোঁজা
সুখবাদের মতে— ‘মানুষ যা করে, তার মূল উদ্দেশ্য সুখ বা আনন্দ পাওয়া।‘
গ্রীক দার্শনিক এপিকুরোস এই ধারাটিকে জনপ্রিয় করেন।
এটি ২ ধরণের রয়েছে।
১। ব্যক্তিগত সুখবাদ: নিজের আনন্দই মুখ্য।
২। সমষ্টিগত সুখবাদ: সমাজের সবার আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া।
আজকের ভোগবাদী সংস্কৃতি, বিনোদন, এমনকি বিজ্ঞাপনেও সুখবাদের প্রভাব স্পষ্ট।
বুদ্ধিবাদ; যুক্তি দিয়ে সত্যের খোঁজ
বুদ্ধিবাদে বলা হয়—**জ্ঞান অর্জনের আসল পথ হলো যুক্তি।**
ইন্দ্রিয় দিয়ে যা দেখি বা শুনি, তা সব সময় নির্ভুল নয়। কিন্তু যুক্তি দিয়ে আমরা সত্যের কাছাকাছি যেতে পারি।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আইন, গণতন্ত্র—সব ক্ষেত্রেই বুদ্ধিবাদের বড় ভূমিকা আছে।
—
শেষ কথা: মতের ভিন্নতাই চিন্তার শক্তি
অজ্ঞেয়বাদ, ভাববাদ, ঐতিহাসিকতাবাদ, সুখবাদ আর বুদ্ধিবাদ—প্রতিটি আমাদের চিন্তা ও সমাজকে আলাদা দিক থেকে প্রভাবিত করে।
যে সমাজ এসব মতবাদ বুঝে এবং কাজে লাগায়, তারা শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনীতিতে নয়, মানুষের জীবনযাপন ও মানবিকতার দিক থেকেও এগিয়ে যায়।
মত বদলাবে, সময় বদলাবে—কিন্তু সত্যের খোঁজে মানুষের যাত্রা থামবে না।




