Monday, December 1, 2025
Google search engine
Homeদর্শনদর্শনের ইতিহাস পর্ব ৫: মুসলিমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়

দর্শনের ইতিহাস পর্ব ৫: মুসলিমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়

গ্রীক দর্শনের সাথে মুসলিম দর্শনের মিশ্রণ শুরু হয় নবম শতাব্দীতে। তবে এর আগেই মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং তার সাথে যুক্ত ধর্মীয় বিতর্ক গড়ে উঠেছিল। এসব দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নেয় ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ, যা পরবর্তীতে ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিয়া, সুন্নি ও খারিজী—এই তিনটি ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্প্রদায়। এছাড়াও শিয়াদের মধ্যেও বিভিন্ন উপদল গড়ে ওঠে, যেমন যায়েদি, বারো ইমামপন্থী (ইসনা আশারিয়া) এবং সাত ইমামপন্থী ইসমাইলিয়া।

খারিজী সম্প্রদায়: বিদ্রোহের সূচনা

৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা) যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিলেন, তখন মুয়াবিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন এবং আলী (রা) তা মেনে নেন। এই সিদ্ধান্ত তাঁর অনুসারীদের একটি অংশ মেনে নিতে পারেনি। তারা আলী (রা)-এর নেতৃত্বে সন্দেহ প্রকাশ করে এবং বিদ্রোহ করে বসে। এদেরকে বলা হয় খারিজী।

খারিজীরা বিশ্বাস করত ইমাম বা নেতা নির্বাচন গণতান্ত্রিকভাবে হতে হবে। আরব বা কুরাইশ বংশ থেকে আসা জরুরি নয়; যে কেউ প্রকৃত মুসলিম হলে নেতা হতে পারবেন, এমনকি নারীও। তারা মনে করত, কোনো ইমাম যদি বড় পাপ করে, তবে তাকে সরিয়ে দেওয়া বা এমনকি হত্যা করাও বৈধ। ইতিহাসে দেখা যায়, হযরত আলীকে হত্যাকারীও ছিলেন এক খারিজী।

যদিও খারিজীরা অন্য মুসলমানদের প্রতি কঠোর বৈরিতা দেখিয়েছিল, তবু এদের মধ্যে একটি মধ্যপন্থী দল ছিল—বসরার আবেদি সম্প্রদায়—যারা তুলনামূলকভাবে সহনশীল ও বিনয়ী ছিল। বর্তমানে উত্তর আফ্রিকা ও ওমান অঞ্চলে তাদের প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

দর্শনের ইতিহাস পর্ব – ৩: এরিস্টটল ও হেলেনিয় দর্শন

সুন্নি সম্প্রদায়: সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথ

“সুন্নি” শব্দ এসেছে সুন্নাহ থেকে, যার অর্থ নবী মুহাম্মদের জীবন ও কর্ম। সুন্নি মতবাদ গড়ে ওঠে নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর, যখন খলিফা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আবু বকর (রা)-কে বেছে নেওয়া হয়। সেই অনুসারীরাই পরবর্তীতে সুন্নি মুসলিম নামে পরিচিত হয়।

সুন্নিরা বিশ্বাস করে যে খলিফা অবশ্যই একজন মুসলিম হবেন, তবে তিনি নবীর বংশধর হওয়া জরুরি নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচিত যে কেউ খলিফা হতে পারেন। তারা খেলাফতের ক্ষেত্রে শুরা (পরামর্শ সভা) পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয়।

ধর্মীয়ভাবে সুন্নিরা চারটি প্রধান মাজহাবে বিভক্ত—হানাফি, মালিকি, শাফিয়ি ও হাম্বলি। এছাড়াও রয়েছে আহলে হাদিসসহ কিছু সংখ্যালঘু মতবাদ। কোরআন ও হাদিসকে ভিত্তি মেনে সুন্নিরা ইজমা ও কিয়াসকে ইসলামি আইনের পরিপূরক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

শিয়া সম্প্রদায়: ইমামতের ধারণা

শিয়া মতবাদ প্রথমে ছিল একটি রাজনৈতিক অবস্থান, কিন্তু পরে তা পূর্ণাঙ্গ ধর্মমতে পরিণত হয়। এর মূল ভিত্তি হলো ইমামতের ধারণা।

শিয়ারা বিশ্বাস করে যে ইমাম নির্বাচিত হবেন ঐশ্বরিকভাবে, মানুষের ভোটে নয়। ইমাম অবশ্যই নবী মুহাম্মদ (সা)-এর কন্যা ফাতিমা ও হযরত আলীর বংশধর হতে হবে। তারা ইমামকে “মাসুম”—অর্থাৎ সব ভুল ও পাপ থেকে মুক্ত—মনে করে।

আলীর পরিবার উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালালেও রাজনৈতিকভাবে সফল হতে পারেনি। এতে শিয়ারা নানা উপদলে বিভক্ত হয়ে যায়।

যায়েদি শিয়া: মধ্যপন্থী ধারার অনুসারী

ইয়েমেনে উদ্ভূত যায়েদি সম্প্রদায়কে বলা হয় মধ্যপন্থী শিয়া। তারা যায়েদ ইবনে আলীকে ইমাম হিসেবে মানে, যিনি উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।

যায়েদিরা মনে করত যে মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব ফাতিমার বংশধরদের হওয়া উচিত, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্য কাউকে ইমাম নির্বাচিত করা যেতে পারে। তারা প্রথম দুই খলিফা আবু বকর ও ওমরকে স্বীকার করে, যদিও মনে করত আলী ছিলেন অধিক যোগ্য।

বারো ইমামপন্থী শিয়া: ইসনা আশারিয়া

বারো ইমামপন্থীদের মতে, শেষ ইমাম মোহাম্মদ বিন হাসান (ইমাম মাহদি) জন্মের পর আড়ালে চলে গেছেন এবং তিনি এখনো জীবিত আছেন। শিয়ারা বিশ্বাস করে শেষ যুগে তিনি ফিরে আসবেন এবং মানবজাতির মুক্তি ঘটাবেন। আধুনিক ইরান এই ধারার অনুসারী।

সাত ইমামপন্থী শিয়া: ইসমাইলিয়া

ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক তাঁর পুত্র ইসমাইলকে ইমাম মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে অসদাচরণের কারণে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য পুত্র মুসা আল কাজিমকে ইমাম করা হয়। ইসমাইলের কিছু অনুসারী এটি মানেনি। তারা বিশ্বাস করে ইসমাইলের বংশধর আবার মাহদীরূপে ফিরে আসবেন।

ইসমাইলিয়ারা কোরআনের প্রতিটি শব্দের আড়ালে গভীর মরমি অর্থ খোঁজার চেষ্টা করত। তাদের মতে “সাত” সংখ্যার বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে।

উপসংহার

মুসলিম ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের এই ভিন্নতা শুধু রাজনৈতিক লড়াইয়ের কারণে নয়, বরং ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনার পার্থক্যের ফলেও গড়ে উঠেছিল। খারিজীদের কঠোর অবস্থান, সুন্নিদের সংখ্যাগরিষ্ঠভিত্তিক নেতৃত্ব এবং শিয়াদের ঐশ্বরিক ইমামতের বিশ্বাস—সব মিলিয়ে মুসলিম সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসকে করেছে বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular