লিভার আমাদের দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যাকে বলা হয় শরীরের পাওয়ার হাউস। এটি শরীরের বিপাক, পুষ্টি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেওয়ার কাজ করে। লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলে আস্তে আস্তে শরীরে বাসা বাঁধে নানা জটিল রোগ। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—শুরুর দিকে লিভারের রোগগুলো প্রায় কোনো লক্ষণ ছাড়াই বৃদ্ধি পায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে মানুষের লিভার খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ কিছু সাধারণ বদঅভ্যাস ও অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা। তাই লিভারের রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
লিভার রোগের প্রধান কারণ
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (অতিরিক্ত তেল–মসলাযুক্ত খাবার)
- অতিরিক্ত মদ্যপান ও ধূমপান
- মানসিক চাপ বা দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস
- স্থূলতা ও অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া (ফ্যাটি লিভার)
- ভাইরাস সংক্রমণ (হেপাটাইটিস A, B, C ইত্যাদি)
- অতিরিক্ত ওষুধ সেবন
- শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
সতেজতার জন্য কোমল পানীয় পান করে নিস্তেজতা ডেকে আনছেন না তো?
লিভার রোগের ধরণ
- লিভারের বিভিন্ন রূপে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন—
- লিভার সিরোসিস
- ফ্যাটি লিভার (নীরব ঘাতক, বাংলাদেশে প্রায় ৩০% মানুষ এতে আক্রান্ত)
- লিভার ক্যান্সার
- ভাইরাল হেপাটাইটিস
- পিত্তথলি বা পিত্তনালীর রোগ
- লিভারের ফোঁড়া
লিভার রোগের লক্ষণ
- লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত হলে শরীরে কিছু স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন—
- এনার্জি কমে যাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী অবসন্নতা
- ঘন ঘন বমি হওয়া
- মুখে তেতো স্বাদ
- তেল–চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার পর পেট ব্যথা
- পিত্ত তৈরিতে সমস্যা
- চোখে ব্যথা, মল ফ্যাকাসে রঙের হওয়া
- ওজন কমে যাওয়া ও ক্ষুধামন্দা
- জন্ডিস (শরীর হলুদ হয়ে যাওয়া)
- হাত–পায়ে পানি আসা
যদি এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা হয়, তবে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে ক্যান্সার পর্যন্ত গড়াতে পারে।
পিট্যুইটারি গ্রন্থি: মাথার ছোট্ট নিয়ন্ত্রক, বিশাল ক্ষমতার অধিকারী
লিভার ভালো রাখার ১০টি উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে লিভার সুস্থ রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চলা জরুরি।
1. লো ফ্যাট ফুড থেকে সাবধান
বাজারে পাওয়া লো–ফ্যাট খাবারে প্রায়ই অতিরিক্ত চিনি যোগ করা থাকে। এটি ক্ষতিকর।
2. হারবাল কেয়ার গ্রহণ
মিল্ক থিসল, হলুদ, ড্যানডেলিয়ন রুটের মতো ভেষজ উপাদান লিভারের কার্যকারিতা বাড়ায়।
3. স্ট্রেস কমান
মানসিক চাপে থাকলে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ এ সময় হজম প্রক্রিয়া ঠিকমতো কাজ করে না।
4. হেলদি ফ্যাট খান
বাদাম, মাছ, অলিভ অয়েলের মতো ভালো ফ্যাট লিভারের জন্য উপকারী।
5. টক্সিন থেকে দূরে থাকুন
কেমিক্যাল স্প্রে, প্রসাধনী ইত্যাদির টক্সিন ত্বক দিয়ে রক্তে প্রবেশ করে লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
6. লেবু ও ফল খান
লেবুর ভিটামিন–সি ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট লিভার পরিষ্কার রাখে এবং হজম শক্তি বাড়ায়।
7. রসুন খান
রসুনে থাকা অ্যালিসিন ও সেলেনিয়াম লিভারের টক্সিন দূর করে।
8. কফি পান করুন
গবেষণায় দেখা গেছে, কফি নিয়মিত পান করলে লিভারের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১৪% কমে।
9. অতিরিক্ত ওষুধ থেকে বিরত থাকুন
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে।
10. প্রতিদিন আপেল খান
আপেলের পেকটিন ফাইবার শরীর থেকে টক্সিন ও কোলেস্টেরল বের করে দেয় এবং লিভারকে সুরক্ষা দেয়।
উপসংহার
লিভার আমাদের দেহের সবচেয়ে কার্যকরী অঙ্গগুলোর একটি। একে সুস্থ রাখা মানে পুরো শরীরকে সুস্থ রাখা। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তন করে, নিয়মিত ব্যায়াম, ভেষজ খাবার, লেবু–রসুন–আপেলের মতো প্রাকৃতিক উপাদান গ্রহণ এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লিভারকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা সম্ভব।




