Thursday, February 26, 2026
Google search engine
Homeদর্শনদর্শনের ইতিহাসঃ পর্ব ১।প্রাচীন গ্রীক দর্শনের উত্থান ও সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকদের অবদান

দর্শনের ইতিহাসঃ পর্ব ১।প্রাচীন গ্রীক দর্শনের উত্থান ও সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকদের অবদান

দর্শনের জগতে গ্রীসের অবদান অপরিসীম। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রীক দর্শনের সূচনা ঘটে, যা হেলেনিস্টিক যুগ পেরিয়ে রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। শুধু প্রাচীন পৃথিবী নয়, মুসলিম শাসনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিন্তাধারায়ও গ্রীক দর্শনের গভীর প্রভাব রয়েছে।

আজকের আলোচনায় আমরা গ্রীক দর্শনের প্রাচীন পর্বের প্রথম দিক — সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকদের চিন্তা ও অবদান — নিয়ে কথা বলব।

 সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকরা কারা?

অনেকের ধারণা দর্শনের মূল ভিত্তি কেবল সক্রেটিস, প্লেটো এবং এরিস্টটলের হাত ধরেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো — তাদের আগেও বহু প্রতিভাবান দার্শনিক ছিলেন, যাদের চিন্তাধারা পরবর্তী দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করে। এরা নিজেদের মতবাদে ছিলেন স্বাধীন, এবং তৎকালীন ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে দূরে সরে এসে বিশ্বের উৎপত্তি ও মানুষের অস্তিত্বের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। 

থেলিস — দর্শনের আদি পিতা

মাইলেটাসের বাসিন্দা থেলিসকে অনেকেই প্রথম গ্রীক দার্শনিক এবং “দর্শনের জনক” বলে অভিহিত করেন। তার আগে ধর্ম এবং দর্শনের মধ্যে তেমন পার্থক্য ছিল না; ধর্মীয় কাহিনিকেই সত্য বলে ধরা হতো। কিন্তু থেলিস প্রথম পৌরাণিক কল্পকাহিনী বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্বজগতের উৎপত্তি বোঝানোর চেষ্টা করেন।

তার মতে, সব কিছুর আদি উপাদান হলো পানি। মাটি, গাছপালা, প্রাণী — সবকিছুই পানির উৎস থেকে এসেছে। গ্রীকদের বাণিজ্য নদী ও সমুদ্রনির্ভর ছিল, তাই পানির গুরুত্ব তাদের কাছে অপরিসীম। থেলিস মিশরের নীলনদ সভ্যতাকেও উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন।

দর্শন ছাড়াও, থেলিস জ্যোতির্বিদ্যা ও অঙ্কে দক্ষ ছিলেন। পিরামিডের ছায়া দেখে এর উচ্চতা নির্ণয় করার জন্য তিনি বিখ্যাত হন। তিনি প্রমাণ করেন, অঙ্ক কেবল হিসাব নয়, বরং যুক্তির উপর নির্ভরশীল এক শাস্ত্র।

অ্যানাক্সিমেন্ডার — অসীম থেকে সৃষ্টির ধারণা

থেলিসের শিষ্য অ্যানাক্সিমেন্ডার বিশ্বাস করতেন, বিশ্বের জন্ম এক *অসীম উপাদান* থেকে। এই অসীম উপাদানের গতি থেকে তাপ ও শীতের সৃষ্টি হয়, যার সংঘর্ষে ভূমি, জল, বায়ু ও অগ্নির জন্ম হয়। তার মতে, প্রথম প্রাণ জন্ম নিয়েছে সমুদ্রে, এবং মানুষ এসেছে সামুদ্রিক প্রাণী থেকে।

তিনি পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র আঁকেন এবং জানান, পৃথিবী গোলকাকৃতি। সূর্যের আকার পৃথিবীর তুলনায় ২৯ গুণ বড় বলেও তিনি মত দেন।

পিথাগোরাস — সংখ্যার জগতে দর্শন

গণিতের জগতে “পিথাগোরাস” নামটি চিরস্মরণীয়। কিন্তু তিনি কেবল গণিতবিদই নন, বরং সংগীত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ধর্মীয় চিন্তায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন। তিনি আত্মার অমরত্ব ও পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন — “সবকিছুর মূল হলো সংখ্যা”।

পিথাগোরাসের মতে, পৃথিবীর অস্তিত্ব ও গঠন ব্যাখ্যা করা যায় সংখ্যার সম্পর্ক দিয়ে। তিনি সংগীতকেও সংখ্যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক সংগঠন পরবর্তীতে রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

হেরাক্লিটাস — পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুব সত্য

হেরাক্লিটাস বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর মূল উপাদান আগুন। তার মতে, মানুষের আত্মা আগুন ও পানি দিয়ে গঠিত, আর যার আত্মায় যত বেশি আগুন, সে মানুষ তত মহৎ।

তার অন্যতম বিখ্যাত উক্তি — “কেউ একই নদীতে দুইবার পা রাখতে পারে না” — যার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল।

পারমিনাইডস — স্থায়ীত্বের দর্শন

পারমিনাইডস হেরাক্লিটাসের সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করতেন। তিনি বলতেন, পৃথিবীতে কোন পরিবর্তন ঘটে না, সবকিছুই স্থায়ী। জন্ম ও মৃত্যু কেবল ধারণা, বাস্তবে সবকিছু চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।

অ্যানাক্সগোরাস — বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের পথিকৃৎ

অ্যানাক্সগোরাস বিশ্বাস করতেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তা এসেছে তার শারীরিক গঠনের জন্য, আত্মার জন্য নয়। তিনি প্রথম লক্ষ্য করেন যে চাঁদের নিজের আলো নেই, বরং সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। চাঁদে পাহাড় আছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ডেমোক্রিটাস — অনুবাদের জনক

ডেমোক্রিটাস “অণু তত্ত্ব” প্রবর্তন করেন। তার মতে, সব বস্তু ক্ষুদ্র অবিভাজ্য কণা ‘অণু’ দিয়ে গঠিত। ভারী ও হালকা বস্তু অণুর ঘনত্ব ও বিন্যাসের পার্থক্যের কারণে তৈরি হয়।

তিনি মনে করতেন, সভ্যতার উদ্ভব মানুষের প্রয়োজন থেকে, আর বিলাসিতা ও অসতর্কতা সভ্যতার পতন ঘটায়। সুখ মানে মানসিক শান্তি — এ ধারণাও তার কাছ থেকে এসেছে।

শেষকথা

সক্রেটিস-পূর্ব দার্শনিকরা গ্রীক দর্শনের সেই ভিত্তি স্থাপন করেছেন, যার উপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে সক্রেটিস, প্লেটো ও এরিস্টটল তাঁদের মতবাদ গড়ে তোলেন। তাদের যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা এবং জ্ঞানের প্রতি অদম্য কৌতূহল আজও দর্শন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সমান প্রাসঙ্গিক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular